আরোগ্য বাংলা
খাদ্য ও পুষ্টি ২১ মে, ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১০ জুলাই, ২০২৬ 11 মিনিট পড়ুন

পেটের গ্যাস ও গ্যাস্ট্রিক কমানোর দ্রুত ঘরোয়া উপায়

পেটের গ্যাস ও গ্যাস্ট্রিক কমানোর ঘরোয়া উপায়, লক্ষণ ও কারণ, হিং-জোয়ান-জিরা-মৌরির টোটকা, কি খাবেন কি এড়াবেন, কোন ওষুধ ও কখন ডাক্তার দেখাবেন নিয়ে বাংলা গাইড।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

পেটের গ্যাস ও গ্যাস্ট্রিক কমানোর ঘরোয়া উপায়, হিং, জোয়ান, জিরা, মৌরি
সূচিপত্র20টি বিভাগ

দুপুরে ভরপেট খিচুড়ি-ইলিশ, তারপর বিকেলে পেট যেন বেলুনের মতো ফুলে উঠছে। হাঁটতে অসুবিধা, প্যান্টের বোতাম খুলে দিতে ইচ্ছে করছে, আর ক্ষণে ক্ষণে অস্বস্তিকর ঢেকুর ও গ্যাস। বাঙালি পেটের এই গল্পটি প্রায় সবার চেনা।

পেটের গ্যাস বা গ্যাস্ট্রিক দ্রুত কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হাতে গোনা কয়েকটি। খাবারের পর ধীরে ১০ মিনিট হাঁটা, এক গ্লাস কুসুম গরম জল, এক চিমটি হিং বা এক চামচ জোয়ান ভেজানো জল, আর শুয়ে হাঁটু বুকে টেনে পবনমুক্তাসন। এগুলো জমা বাতাস বেরোতে সাহায্য করে বলে বহু বাঙালি ঘরে ও কিছু গবেষণায় উল্লেখ আছে। আয়ুর্বেদে পেট ফাঁপাকে বলা হয়েছে আধ্মান এবং তীব্র গ্যাস-জনিত অস্বস্তিকে আনাহ। আজকের লেখায় থাকছে গ্যাস কেন হয়, লক্ষণ কী, দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি ঘরোয়া উপায়, কী খাবেন কী এড়াবেন, কখন ওষুধ লাগে আর কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। মনে রাখবেন, এটি চিকিৎসা পরামর্শ নয়, তথ্যমূলক আলোচনা মাত্র।

এক নজরে

  • সমস্যাটা কী। হজমের সময় অন্ত্রে তৈরি হওয়া বাতাস অতিরিক্ত জমলে বা বেরোতে না পারলে পেট ফাঁপে ও ব্যথা করে।
  • দ্রুত উপশম। হাঁটা, কুসুম গরম জল, হিং-জল, পবনমুক্তাসন, বাম কাত হয়ে শোয়া।
  • দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। ভাল করে চিবিয়ে পরিমিত খাওয়া, নিজের ট্রিগার খাবার চিনে নেওয়া, খাবারের পর হাঁটা।
  • গ্যাস্ট্রিক আর অ্যাসিডিটি এক নয়। একটি বাতাসের, অন্যটি অ্যাসিডের সমস্যা।
  • সতর্কতা। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস, তীব্র ব্যথা, রক্তমল বা ওজন কমা থাকলে ঘরোয়া উপায় নয়, ডাক্তার।

গ্যাস্ট্রিক, গ্যাস আর অ্যাসিডিটির পার্থক্য কী?

বাংলায় "গ্যাস্ট্রিক" শব্দটি দিয়ে আমরা আসলে তিনটি আলাদা সমস্যাকে একসঙ্গে বোঝাই, অথচ এদের কারণ ও সমাধান এক নয়। পেটের গ্যাস মূলত অন্ত্রে জমা বাতাসের সমস্যা, অম্বল বা অ্যাসিডিটি পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরে উঠে আসার সমস্যা, আর "গ্যাস্ট্রাইটিস" হলো পাকস্থলীর ভিতরের আবরণে প্রদাহ। কোনটি হচ্ছে তা বুঝলে সঠিক উপায় বেছে নেওয়া সহজ হয়।

বিষয় পেটের গ্যাস / পেট ফাঁপা অ্যাসিডিটি / অম্বল গ্যাস্ট্রাইটিস
মূল কারণ অন্ত্রে জমা বাতাস পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর আবরণে প্রদাহ
প্রধান উপসর্গ ফাঁপা, ঢেকুর, বায়ু, নাভির আশপাশে ব্যথা বুক জ্বালা, টক ঢেকুর, গলায় জ্বালা উপরের পেটে জ্বালা-ব্যথা, বমি ভাব
আয়ুর্বেদিক দোষ মূলত বাত মূলত পিত্ত পিত্ত ও কখনো আম
সাধারণ ট্রিগার ডাল, বাঁধাকপি, বাতাস গেলা ঝাল-ভাজা, খালি পেটে অ্যাসিড দীর্ঘ ব্যথানাশক, সংক্রমণ

অম্বল ও বুক জ্বালার বিস্তারিত ঘরোয়া সমাধান আলাদা করে লিখেছি অ্যাসিডিটি দূর করার লেখায়। এই লেখায় আমরা মূলত বাতজনিত গ্যাস ও পেট ফাঁপা নিয়েই কথা বলব।

আয়ুর্বেদে গ্যাস ও পেট ফাঁপার ধারণা

আয়ুর্বেদে পেটের গ্যাসকে দেখা হয় দুর্বল পাচন-অগ্নি ও বাত দোষের অস্বাভাবিক গতির ফল হিসেবে। চরক ও সুশ্রুত সংহিতা মতে বাত দোষের স্থান প্রধানত নাভির নিচের অংশে, অর্থাৎ পেট ও অন্ত্রে। যখন পাচন-অগ্নি দুর্বল হয়, খাবার ঠিকঠাক হজম না হয়ে আম নামের অপাচিত পদার্থ তৈরি করে, তখন বাত তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে উল্টো দিকে চলতে শুরু করে। শাস্ত্রে একে বলা হয়েছে "উদাবর্ত।"

আধুনিক চিকিৎসাতেও ছবিটা কাছাকাছি। পেটের গ্যাস বলতে বোঝায় হজমের সময় অন্ত্রে তৈরি হওয়া বাতাস, মূলত নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন ও মিথেন। অল্প পরিমাণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। দিনে ১৩ থেকে ২১ বার বায়ু নিঃসরণ চিকিৎসকদের ভাষায় স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই পড়ে। সমস্যা শুরু হয় যখন এই বাতাস অতিরিক্ত জমে বা সহজে বেরোতে পারে না।

পূর্বের হজম শক্তির লেখায় দেখিয়েছি, পাচন-অগ্নি দুর্বল হলে শুধু হজম নয়, পুরো শরীরের ভারসাম্য বিগড়োয়। গ্যাস তারই একটি বহিঃপ্রকাশ। আম কেন জমে সেই লেখাটিও এই প্রসঙ্গে পড়ে দেখতে পারেন।

পেটে গ্যাস হওয়ার কারণ

পেটে গ্যাস জমার পেছনে সাধারণত অভ্যাস ও খাবার, দুটোই কাজ করে। আয়ুর্বেদ আর আধুনিক চিকিৎসা, দুই দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে প্রায় একই কারণ চিহ্নিত করে। নিচের তালিকাটি একবার পড়ে দেখুন, নিজের অভ্যাসের সঙ্গে কতগুলো মিলে যায়।

  1. অতিরিক্ত খাওয়া, পেট পুরো ভরিয়ে ফেলা
  2. খুব দ্রুত খাওয়া বা ভাল করে না চিবোনো, ফলে অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা (একে বলে অ্যারোফেজিয়া)
  3. খাবারের সময়ে অতিরিক্ত জল খাওয়া
  4. অনিয়মিত খাবারের সময়
  5. অড়হর, রাজমা, ছোলা জাতীয় শক্ত ডাল
  6. বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলি, কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন
  7. দুগ্ধজাত পণ্য, ল্যাকটোজ-অসহিষ্ণু ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে
  8. কোমল ও কার্বনেটেড পানীয়
  9. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
  10. পর্যাপ্ত ঘুম ও পরিশ্রমের অভাব
  11. কিছু ওষুধ, যেমন কিছু পেইনকিলার ও অ্যান্টিবায়োটিক
  12. খাবার পরেই শুয়ে পড়া
  13. বিরুদ্ধ আহার, শাস্ত্রে নিষেধ, যেমন দুধ ও মাছ একসঙ্গে

গ্যাস্ট্রিক ও পেট ফাঁপার লক্ষণ

গ্যাস্ট্রিক বা পেট ফাঁপার লক্ষণ চেনা কঠিন নয়, কারণ এগুলো প্রায় সবাই কখনো না কখনো টের পেয়েছেন। সবচেয়ে সাধারণ প্রকাশ পেট ভার হয়ে ফুলে থাকা, ঘন ঘন ঢেকুর, আর বায়ু নিঃসরণ। অনেকে পেটের ভিতর গুড়গুড় শব্দ শোনেন, কেউ আবার এমন এক চাপা ব্যথা টের পান যা জায়গা বদলায়, একবার বাঁ দিকে তো একবার ডান দিকে।

কম-চেনা কিছু লক্ষণও আছে। জমা গ্যাস কখনো বুকের কাছে চাপ তৈরি করে, যা অনেকের কাছে হৃদযন্ত্রের সমস্যা বলে ভয় ধরিয়ে দেয়। এই বিভ্রান্তিটাই বিপজ্জনক। বুকে চাপ বা ব্যথা যদি বাঁ হাত, চোয়াল বা ঘামের সঙ্গে আসে, সেটিকে কখনোই "শুধু গ্যাস" ভেবে বসে থাকবেন না, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। সাধারণ গ্যাসের অস্বস্তি বেশিরভাগ সময় ঢেকুর বা বায়ু বেরোলেই হালকা হয়, আর তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

দ্রুত গ্যাস কমানোর উপায়

তাৎক্ষণিক অস্বস্তিতে সবচেয়ে কাজের কয়েকটি উপায় শরীরকে নড়াচড়া করানো আর জমা বাতাসকে বেরোনোর পথ করে দেওয়া। এগুলো ম্যাজিক নয়, কিন্তু বহু মানুষ মিনিট কয়েকের মধ্যে হালকা বোধ করেন বলে জানান।

  • ধীরে হাঁটুন। খাবারের পর বা অস্বস্তির সময় ১০ মিনিট আস্তে হাঁটলে অন্ত্রের চলাচল বাড়ে ও বায়ু বেরোতে সাহায্য করে।
  • কুসুম গরম জল। এক গ্লাস কুসুম গরম জল হজমের পথ মসৃণ করে বলে শাস্ত্রে বাত-শান্তির প্রিয় উপাদান হিসেবে উল্লিখিত।
  • হিং-জল। এক গ্লাস কুসুম গরম জলে চিমটেখানেক হিং ও সামান্য সৈন্ধব লবণ গুলে খেলে অনেকে দ্রুত আরাম পান।
  • পবনমুক্তাসন। শুয়ে এক হাঁটু বুকের কাছে এনে দু'হাতে চেপে ধরুন, ৩০ সেকেন্ড, পা বদলে আবার। নামের মানেই "বায়ুমুক্তির আসন।"
  • বাম কাত হয়ে শোয়া। বাঁ দিকে কাত হয়ে শুলে অন্ত্রের বাঁক ধরে গ্যাস সহজে এগোতে পারে বলে মনে করা হয়।
  • পেটে হালকা মালিশ। নাভির চারপাশে ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিলে জমা বাতাস নড়ে।

কোনো প্রতিকারই "৫ সেকেন্ডে সব গ্যাস বের" করে দেয় না, এমন দাবি করা ভিডিও-বিজ্ঞাপন দেখলে সতর্ক থাকুন। শরীর ভেদে সময় আলাদা।

ঘরোয়া ভেষজ উপায়

বাঙালি রান্নাঘরের অনেক মশলাই আসলে কারমিনেটিভ, অর্থাৎ পেটের গ্যাস কমাতে সহায়ক বলে চিকিৎসা-শাস্ত্রে চিহ্নিত। এগুলো হাতের কাছেই থাকে, আর দ্রুত উপশমের চেয়ে নিয়মিত ব্যবহারে বেশি কাজে আসে।

জোয়ান-জল

জোয়ান বা আজওয়াইন বীজে থাকা থাইমল হজমে ও গ্যাসে সহায়ক বলে গবেষণায় ইঙ্গিত আছে। ১ চামচ জোয়ান বীজ এক গ্লাস জলে ৫ থেকে ১০ মিনিট ফুটিয়ে, ছেঁকে, দিনে ১ থেকে ২ বার। ঝাঁঝালো গরম গন্ধটাই বলে দেয় এতে উদ্বায়ী তেল আছে। বিস্তারিত পড়ুন জোয়ানের লেখায়

জিরা পানি

জিরা পানি গ্যাস ও হজম, দুটোতেই সহায়ক বলে শাস্ত্রে ও পর্যবেক্ষণে উল্লিখিত। রাতে এক চামচ জিরা এক গ্লাস জলে ভিজিয়ে সকালে ছেঁকে খালি পেটে খাওয়া যায়, সারারাত ভিজে জল হালকা সোনালি রঙ ধরে। জিরা পানির পূর্ণ লেখায় পদ্ধতি বিস্তারিত দিয়েছি।

মৌরি জল ও মৌরি চিবোনো

মৌরির এসেনশিয়াল অয়েল হজমে ও গ্যাসে সহায়ক বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে। খাবারের পর এক চামচ মৌরি চিবোনো বাঙালি ঘরের চিরাচরিত অভ্যাস, সবুজ দানার মিষ্টি ঘ্রাণে মুখ সতেজ হয়, পেটও হালকা লাগে। মৌরির নানা ব্যবহার নিয়ে আলাদা লেখা আছে

পুদিনা

পুদিনা পাতার এসেনশিয়াল অয়েল আইবিএস-জনিত গ্যাস ও ব্যথায় সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে (BMC Complementary Medicine) পেপারমিন্ট অয়েল আইবিএস-এর উপসর্গে প্লাসিবোর তুলনায় বেশি উপকারী দেখা গেছে, যদিও নমুনা সীমিত। কয়েকটি পুদিনা পাতা কুসুম গরম জলে বা চায়ে দিতে পারেন।

আদা-লেবু

আদা হজম-অগ্নি জাগাতে সহায়ক বলে বহু ব্যবহৃত। সামান্য আদার কুচি ও কয়েক ফোঁটা লেবুর রসে এক চিমটি সৈন্ধব লবণ, খাবারের ১৫ মিনিট আগে, ঝাঁঝালো আদা আর টক লেবুর গন্ধেই জিভে জল আসে। আদার লেখায় এর নানা প্রয়োগ আলোচিত।

ত্রিফলা চূর্ণ

ত্রিফলা দীর্ঘমেয়াদে অন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক বলে শাস্ত্রে উল্লিখিত, বিশেষত গ্যাসের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে। রাতে এক চামচ কুসুম গরম জলে নেওয়া যায়, স্বাদ কষা-তেতো, প্রথম কয়েকদিন একটু অভ্যেস লাগে। মাত্রা ও সতর্কতা ত্রিফলার লেখায় দেওয়া আছে।

কি খাবেন আর কি এড়াবেন

গ্যাস কমাতে খাবারের নির্বাচনই সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক। কিছু খাবার হজমে সাহায্য করে ও পেট হালকা রাখে, আবার কিছু খাবার অনেকের ক্ষেত্রে বাতাস তৈরি করে। মনে রাখবেন, এটি ব্যক্তি-নির্ভর, তাই নিজের শরীরের সাড়া দেখেই তালিকা বানান।

যা পেট হালকা রাখতে সহায়ক যা অনেকের গ্যাস বাড়ায়
টক দই ও প্রোবায়োটিক খাবার রাজমা, ছোলা, অড়হর ডাল
পাকা পেঁপে (পাপাইন উৎসেচক) বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলি
আদা, জিরা, মৌরি, জোয়ান কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন
শসা ও লাউ কোমল ও কার্বনেটেড পানীয়
মুগ ডাল (হালকা, সহজপাচ্য) অতিরিক্ত দুধ ও পনির
পাকা কলা ভাজাভুজি ও অতিরিক্ত তেল
পুদিনা সরবিটল জাতীয় কৃত্রিম মিষ্টি

"কোন খাবারে গ্যাস হয় না" এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই, তবে ভাত, মুগ ডাল, লাউ, পাকা পেঁপে ও টক দই তুলনায় কম গ্যাস তৈরি করে বলে অনেকের অভিজ্ঞতা। ডাল রান্নায় জোয়ান বা হিং ফোড়ন দিলে গ্যাস কিছুটা কমে।

দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, খাদ্য ও অভ্যাস

ঘরোয়া উপশম যতই কাজ করুক, গ্যাস চিরতরে দূর করার কোনো জাদু নেই, আসল কাজ অভ্যাসের পরিবর্তনে। নিচের অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে গড়ে তুললে বারবার গ্যাস ফিরে আসা অনেকটাই কমে বলে জানা যায়।

  1. পেট পুরো ভরিয়ে নয়, তিন ভাগ খান, এক ভাগ খালি রাখুন
  2. ভাল করে চিবোন, প্রতিটি গ্রাস ২০ থেকে ৩০ বার
  3. খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত জল নয়, অল্প অল্প চুমুক
  4. নিয়মিত সময়ে খাবার
  5. কাঁচা ডাল ও শক্ত শস্য ভাল করে ভিজিয়ে রান্না
  6. ভারী ডালের আগে হজম-সহজ মুগ ডাল
  7. খাবার পরে অন্তত ২ ঘণ্টা শোবেন না
  8. খাবারের পর ১০ মিনিট হাঁটা, শাস্ত্রে যাকে বলে "শতপাবলি"
  9. মানসিক চাপ কমানো, প্রাণায়াম ও ধ্যান
  10. দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম
  11. রান্নার ফোড়নে জিরা, হিং, জোয়ান, আদা
  12. নিজের ট্রিগার চিনুন, ২ থেকে ৩ সপ্তাহের ফুড ডায়েরি অমূল্য

মানসিক চাপ যে হজমে সরাসরি প্রভাব ফেলে, তা অনেকেই টের পান পরীক্ষার আগে বা টেনশনের দিনে পেট গুলিয়ে উঠলে। চাপ সামলানোর আলাদা আয়ুর্বেদিক উপায় নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি।

গ্যাসের জন্য ওষুধ কখন লাগে?

গ্যাসের জন্য দোকানে যেসব ওষুধ পাওয়া যায় সেগুলো মূলত উপসর্গ কমায়, মূল কারণ সারায় না, এটুকু বোঝা জরুরি। কোনটি কী কাজ করে তা জানা থাকলে অন্তত অন্ধভাবে ওষুধ খাওয়া এড়ানো যায়। তবে নিচের কোনো তথ্যই প্রেসক্রিপশন নয়, ওষুধ শুরুর আগে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

ওষুধের ধরন সাধারণত কী করে মনে রাখার কথা
সিমেথিকোন পাকস্থলীতে গ্যাসের বুদবুদ ভেঙে দেয় সাময়িক আরাম, কারণ সারায় না
অ্যান্টাসিড অ্যাসিড প্রশমিত করে বেশি কাজে লাগে অম্বলে, গ্যাসে নয়
প্রোবায়োটিক অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়ায় ফল ধীরে, ব্যক্তিভেদে আলাদা
পিপিআই পাকস্থলীর অ্যাসিড কমায় প্রেসক্রিপশনভিত্তিক, দীর্ঘদিন নিজে নয়

অনেকেই অভ্যাসবশত রোজ অ্যান্টাসিড বা অ্যাসিড কমানোর ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেন, আর ভাবেন সমস্যা মিটে গেছে। চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে সতর্ক করেন, কারণ দীর্ঘদিন নিজে নিজে এসব খেলে আসল রোগ ঢাকা পড়ে যেতে পারে ও পুষ্টি শোষণে সমস্যা হতে পারে। ঘরোয়া উপায় ও অভ্যাসেই বেশিরভাগ হালকা গ্যাস সামলানো যায়, ওষুধ শেষ ভরসা, প্রথম নয়।

কে সতর্ক থাকবেন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

গ্যাস বেশিরভাগ সময় নিরীহ হলেও কিছু পরিস্থিতিতে এটি বড় সমস্যার সংকেত হতে পারে, তাই এই অংশটি অবহেলা করবেন না। নিচের যেকোনো একটি মিললে ঘরোয়া উপায় ছেড়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

  • কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও ফাঁপা
  • পেটে তীব্র ব্যথা ও বমি
  • মলে রক্ত বা কালো-টারের মতো মল
  • ব্যাখ্যাহীন ওজন হ্রাস
  • খাবার গিলতে অসুবিধা
  • জ্বর ও ক্লান্তি গ্যাসের সঙ্গে
  • মলত্যাগের অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন, ডায়েরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ৫০ বছর বয়সের পর প্রথমবার দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস
  • পরিবারে অন্ত্রের ক্যান্সার বা প্রদাহজনক অন্ত্ররোগের ইতিহাস
  • বুকে চাপ বা ব্যথা, বিশেষত বাঁ হাত বা চোয়ালে ছড়ালে
  • গর্ভাবস্থায় তীব্র পেটে ব্যথা
  • শিশুর দীর্ঘস্থায়ী কান্না ও পেটের সমস্যা

দীর্ঘস্থায়ী পেটের গ্যাস আইবিএস, সিবো (Small Intestinal Bacterial Overgrowth), ল্যাকটোজ-অসহিষ্ণুতা, প্রদাহজনক অন্ত্ররোগ বা কখনো আরও গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। গ্যাসের সঙ্গে যদি দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে, তবে সেটির আলাদা সমাধান দেখে নেওয়া ভাল। সঠিক রোগ-নির্ণয় ছাড়া দীর্ঘ ঘরোয়া যত্ন সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

আমার মনে হয় বাঙালি গ্যাসের সবচেয়ে কম-আলোচিত কারণ, খাবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। আমরা খাই দাঁড়িয়ে, ফোন স্ক্রল করতে করতে, টিভি দেখতে দেখতে। চিবোনোর সময় আধ-অজান্তেই কমে যায়, প্রতিটি গ্রাসের সঙ্গে অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলি। আমি লক্ষ্য করেছি, কয়েকদিন শুধু খাবারে মন দিয়ে, ফোন বাদ দিয়ে ধীরে খেলে পেট অনেকটাই হালকা থাকে। শাস্ত্রে যে "মন দিয়ে খাওয়া"র কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত এটাই সবচেয়ে কম মূল্যের অথচ সবচেয়ে কার্যকর "গ্যাসের ওষুধ।" আপনিও কি খেয়াল করেছেন, তাড়াহুড়োর দিনগুলোতেই পেট বেশি ফাঁপে?

সংক্ষেপে

পেটের গ্যাস ও গ্যাস্ট্রিক একটি সাধারণ সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। দ্রুত উপশমে কাজে আসে হাঁটা, কুসুম গরম জল, হিং-জল ও পবনমুক্তাসন। দীর্ঘমেয়াদে হিং, জোয়ান, জিরা, মৌরি, আদা, পুদিনার মতো বাঙালি রান্নাঘরের উপাদান আর ভাল করে চিবিয়ে পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস। আজ থেকেই ছোট একটি কাজ করুন, আগামী তিনটি দিন খাবারের সময় ফোন সরিয়ে রেখে প্রতিটি গ্রাস অন্তত ২০ বার চিবিয়ে দেখুন, আর একটা ছোট ফুড ডায়েরিতে লিখে রাখুন কোন খাবারের পর পেট ফেঁপেছে। দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র বা অন্য উপসর্গযুক্ত গ্যাসে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র / Sources

  • Alammar N, et al. (2019). The impact of peppermint oil on the irritable bowel syndrome: a meta-analysis of the pooled clinical data. BMC Complementary Medicine and Therapies. PubMed
  • জোয়ান (Trachyspermum ammi) ও কারমিনেটিভ ভেষজের হজম-সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কিত গবেষণা: PubMed search
  • Ministry of AYUSH, Government of India. ayush.gov.in
  • World Health Organization, Traditional, Complementary and Integrative Medicine. who.int
  • চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতা, আধ্মান ও আনাহ প্রসঙ্গ (ধ্রুপদী রেফারেন্স)।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

খাবারের পর ধীরে ১০ মিনিট হাঁটা, এক গ্লাস কুসুম গরম জল, আর শুয়ে হাঁটু বুকে টেনে পবনমুক্তাসন, এই তিনটি সবচেয়ে সহজ ও তাৎক্ষণিক। এক চিমটি হিং কুসুম গরম জলে গুলে খেলেও অনেকে দ্রুত আরাম পান বলে জানান। তবে ব্যথা তীব্র হলে বা বারবার ফিরে এলে ঘরোয়া উপায়ের ভরসা ছেড়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
খিচুড়ি — কাঁসার থালায় মুগ-চালের সাত্ত্বিক খিচুড়ি, ঘি, লেবু ও আদা

খিচুড়ি — আয়ুর্বেদিক সুপারফুড ও সম্পূর্ণ আহার

খিচুড়ি কেন আয়ুর্বেদে সাত্ত্বিক ও ত্রিদোষ-শামক সম্পূর্ণ আহার, মুগ ডাল ও চালের ভূমিকা, পরিপাক-পুনরুদ্ধার ও মোনো-ডায়েট, কীভাবে রান্না ও কখন খাবেন, বাংলায় গাইড।

২৭ মে, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
অ্যানিমিয়া দূর করার খাবার — কালো তিল, কিশমিশ, খেজুর, পালং শাক, ডালিম

অ্যানিমিয়া দূর — আয়ুর্বেদিক খাবার ও বাঙালি ডায়েট

রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় বাঙালি খাবারে কোন আয়রন বেশি, ভিটামিন সি-র ভূমিকা, কোন আয়ুর্বেদিক ভেষজ আলোচিত এবং কখন রক্ত-পরীক্ষা করাবেন, বাংলায় সহজ গাইড।

২৭ মে, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
উচ্চ রক্তচাপে কী খাবেন — বাঙালি ডায়েটে কম-নুন, পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবারের সংগ্রহ

উচ্চ রক্তচাপে কী খাবেন কী এড়াবেন — বাঙালি গাইড

হাই ব্লাড প্রেসারে নুন কমানো, পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার, DASH ডায়েট ও আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাঙালির রান্নাঘরের প্রায়োগিক বাংলায় বিস্তারিত গাইড।

২৬ মে, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ